পূজা শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- সংবর্ধনা, সম্মান প্রদর্শন, শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মহান দর্শন বা আদর্শ অনুসরণ। পূজা আত্মিকও হতে পারে অর্থাৎ স্মরণে-মননেও হতে পারে, হতে পারে পত্র-পুষ্প-চন্দনে অঞ্জলি প্রদানের বাহ্যিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
সনাতন ধর্মাশ্রয়ী বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে মহিষমর্দিনী শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর পূজানুষ্ঠান। ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক তথা নানাবিধ ক্রিয়াকর্ম এই পূজানুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে এ অনুষ্ঠানকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। ভাব-ভক্তি, ইষ্ট-নিষ্ঠা, ভক্তপ্রাণের মুখরতা আর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সৌন্দর্য-সৌকর্যে দুর্গা পূজা আজ অতুলনীয় ধর্মানুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
আচারে-অনুষ্ঠানে, আয়োজনে, অংশগ্রহণে, আকারে-আঙ্গিকে, আনন্দ-উৎসবে এ পূজা আজ ব্যক্তি ও পরিবারের সংকীর্ণ গন্ডী পেরিয়ে পেয়েছে সার্বজনীনরূপ। দুর্গামায়ের আগমনী ছন্দে ছন্দায়িত হয় ভক্তজনের তনুমন। মঙ্গলালোকে উচ্ছ্বসিত, সমুদ্ভাসিত ও উদ্বেলিত হয় শরণাগতের অন্তরাকাশ।
দুর্গাপূজা মূলতঃ শক্তিপূজা। শুভশক্তি আবাহনার্থেই মহিষমর্দিনী দুর্গাময়ের পূজানুষ্ঠান।
নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা আর দুর্গা ও শক্তি পূজার মধ্যে নেই কোন প্রভেদ। কারণ ‘এক ও অদ্বিতীয় নিরতিশয় চৈতন্যস্বরূপ ব্রহ্ম অনাদিসিদ্ধ মায়ার আবরণে ধর্ম ও ধর্মীরূপে প্রতিভাসিত হন।’
অগ্নি ও তার উত্তাপকে যেমন পৃথক করা যায় না, ধর্ম ও ধর্মীকে যেমন স্বতন্ত্র ভাবা যায় না, তেমনি ব্রহ্ম আর শক্তিও অভিন্ন।
দেবী ভগবতে আছে-
“সদৈকত্বং ন ভেদোহস্তি সর্বদৈব মমাস্য চ।
যোহসৌ সাহম্ অহং যাসৌ ভেদোহস্তি মতিবিভ্রমাৎ”
অর্থাৎ “আমি ও ব্রহ্ম এক। উভয়ের মধ্যে ভেদ নেই। যিনি ব্রহ্ম তিনিই আমি। আমি যাহা, তিনিও তাহাই। এই ভেদ ভ্রমকল্পিত, বাস্তব নহে।” ‘আমি’-ই দুর্গা বা শক্তি। সচ্চিদানন্দরূপিণী মহামায়া পরাশক্তি অরূপা হয়েও ভক্তপ্রাণের পরিত্রাণ রূপে ধরা দেন। যিনি সর্বশক্তিমান সব কিছুই তাঁর ইচ্ছাধীন, সব কিছুই তাঁর আয়ত্তাধীন। তাই তিনি নিরাকার পরব্রহ্ম হয়েও স্বেচ্ছায় সাকারে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন। এটাই সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অকৃত্রিম বিশ্বাস।
হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীশ্রী চ-ীতে মহিষমর্দিনী দুর্গার সৃষ্টি সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। অশুভ শক্তির প্রতীক মহীষাসুর দেবতাগণকে স্বর্গচ্যুত করলে হতভাগ্য দেবগণ পরিত্রাণার্থে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা শিব ও দেবগণকে নিয়ে বিষ্ণুর নিকট নিজেদের দুর্গতির করুণ কাহিনী বিবৃত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান।
বিষ্ণুর পরামর্শ অনুযায়ী ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবসহ সকল দেব-দেবী স্ব-স্ব দেহ হতে তেজ নির্গত করে সকলের তেজ সমাহারে সৃষ্টি করলেন এক অপূর্ব নারীমূর্তি। মহিষাসুর বধের জন্য নানা দেবতা নানা অস্ত্রে বিভূষিতা করলেন এই নবতেজসৃষ্ট নারীকে। ইনিই মহিষমর্দিনী দেবী দুর্গা। ইনি প্রথমবার অষ্টাদশভুজা উগ্রচ-ারূপে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার দশভুজা দুর্গারূপে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। ইনিই চ-িকা, চামু-া, নারায়ণী, শাকম্ভরী, সরস্বতী, সনাতনী, মহামায়া, শতাক্ষী, বেদজননী, দেবজননী, জগদ্ধাত্রী, সাবিত্রী, ভগবতী, মহাদেবী, মহাসুরী, পরমেশ্বরী, শিবা, সিংহবাহিনী, কালী, ভদ্রকালী, অম্বিকা, ঈশ্বরী, বরদা, শ্রী, ত্রয়ী, দুর্গা, গৌরী, লক্ষ্মী, অপরাজিতা, পার্বতী, কল্যাণী, শিবানী, শিবদূতী, কাত্যায়নী, সর্বশ্বেরেশ্বরী ইত্যাদি অসংখ্য নামে পূজিতা হয়ে আসছেন যুগে যুগে।
শ্রীশ্রী চণ্ডীর ত্রয়োদশ অধ্যায়ের দশম শ্লোকে বর্ণিত আছে যে, সত্য যুগে রাজ্যহারা মহারাজ সুরথ ও আত্মীয়-স্বজন পরিত্যক্ত সমাধিবৈশ্য যথাক্রমে রাজ্যলাভ ও দুর্গতি মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে মহামায়ার ‘মহীময়ী’ মূর্তি নির্মাণ করে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। ঐ ‘মহীময়ী’ মূর্তিই হাজার হাজার বছর ধরে বাংলাভাষী অঞ্চলে দুর্গামায়ের মৃন্ময়ী প্রতিমা।
ত্রেতাযুগে অযোধ্যার রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠপুত্র শ্রীরামচন্দ্র স্বীয় সতীসাধ্বী স্ত্রী সীতা উদ্ধারের নিমিত্তে লংকাধিপতি রাবণকে বধ করার জন্য দেবীদুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে অকালে দেবীর আরাধনা করেছিলেন। সে সময় থেকেই অকালে অর্থাৎ শরৎকালে শ্রীশ্রী দুর্গাপূজার প্রচলন। এর আগে বসন্তকালে এ পূজা হতো বলে এ পূজাকে বলা হতো বাসন্তী পূজা। এখন শরৎকালে হয় বলে একে বলা হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। স্মর্তব্য যে, বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলেই প্রধানতঃ মৃন্ময়ী প্রতিমায় দুর্গা পূজার প্রচলন। বাঙালি সমাজের বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রে ধাতু, কাষ্ঠ বা প্রস্তর দ্বারা নির্মিত মূর্তিই পূজিত হয়।
দুর্গাপূজার মন্ত্রে আছে-
“রাবণস্য বিনাশায় রামস্যানুগ্রহায় চ অকালে বোধিতা দেবী” অর্থাৎ রাবণের বিনাশের জন্য রামের প্রতি অনুগ্রহ বশতঃ অকালে দেবীদুর্গা বোধিত হয়েছিলেন।”
ঋগে¦দে বিশ্বদুর্গা, সিন্ধুদুর্গা ও অগ্নিদুর্গার উল্লেখ আছে। কালীকা পুরাণ, দেবী পুরাণ, মৎস্য পুরাণ ও বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণে দুর্গা পূজার পদ্ধতি লিপিবদ্ধ আছে বিস্তৃতভাবে। বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত পূজা পদ্ধতিটি বর্তমানে প্রায় সর্বত্রই সমাদৃত। কৌটিল্যের ‘অর্থ শাস্ত্র’ অনুযায়ী খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী থেকেই ‘অপরাজিতা পূজা’ তথা দুর্গাপূজা এদেশে চলে আসছে।
প্রচলিত কিংবদন্তী অনুযায়ী বাংলাদেশের রাজশাহীর অন্তর্গত তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ মোগল স¤্রাট মহামতি আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে নয় লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা করে পূজার ইতিহাসে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন।
** দুর্গা শব্দের নানাবিধ অর্থ আছে। ‘দুর্গ’ শব্দের অর্থ দুঃখ বা দুর্গতি। যিনি নানাবিধ দুঃখ বা দুর্গতি দূর করেন, তিনিই দুর্গা। আবার, যিনি দুর্গাসুর হন্ত্রী, তিনিই দুর্গা।
স্কন্দ পুরাণ অনুযায়ী যিনি অতি দুর্গম ‘দুর্গ’ নামক দৈত্যকে সম্মুখ সমরে বধ করেন- তিনিই দুর্গা। আবার, যিনি কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য ইত্যাদি ষড় রিপুর আক্রমণ থেকে সাধক ভক্তের দেহদুর্গকে রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা।
মানব সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই সুর-অসুরের ভাল-মন্দের, সভ্য-অসভ্যের, সত্য-অসত্যের, শুভ-অশুভের সংগ্রাম চলে আসছে। অশুভ শক্তির প্রাদুর্ভাবে সমাজে-রাষ্ট্রে নেমে আসে অবিচার, অত্যাচার, সন্ত্রাস, খুন-জখম, শোষণ, ত্রাসন, পেষণ, দংশন, লুণ্ঠন, অনাচার, ব্যভিচার, দুষ্কর্ম, দ্বেষ-বিদ্বেষ, হিংসা, জিঘাংসা। নেমে আসে দুর্গতি, দুর্ভাগ্য, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অভাব-অনটন, ভয়-ভীতি, নিরাশা, হতাশা আর নিরাপত্তাহীনতা। তাই সর্ববিধ্বংসী অশুভ শক্তির বিনাশার্থে হিন্দু ভক্তবৃন্দ মহিষমর্দিনী শ্রীশ্রী দুর্গার পূজা করেন অটল বিশ্বাসে, অবিচল আস্থায়, সুদৃঢ় প্রত্যয়ে, অচলা ভক্তিতে।
** দুর্গা প্রতিমার কাঠামোর আছে একটি বিশেষ দর্শন যা বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য।
এই কাঠামোতে আছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, সিংহ, মহিষ এবং শ্রীশ্রী দুর্গা এবং তাঁর পশ্চাতে দেবাদিদেব শিব।
লক্ষ্মী —- ধন-সম্পদের দেবী। সরস্বতী—– জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী। কার্তিক—- বলবীর্য ও সাহসের প্রতীক। গণেশ হলেন—– গণশক্তির প্রতীক। শিব—- শান্তির প্রতীক। মহিষাসুর —— অশুভ শক্তির প্রতীক। দুর্গা হচ্ছেন সকল শুভ শক্তির সম্মিলিত প্রতীক। যে কোন রাষ্ট্রের বা সমাজের সার্বিক উন্নতি করতে হলে অবশ্যই লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ অর্থাৎ ধন, জ্ঞান, বলবীর্য ও গণশক্তির সম্মিলিত প্রয়াসের একান্ত প্রয়োজন। এই সামষ্টিক শক্তিই অশুভ শক্তিকে পদানত-পরাস্ত করে সমাজে, রাষ্ট্রে শিবের অর্থাৎ শান্তির প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
সবশেষে হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর বুকে অপার শান্তি কামনার্থে আকুল হয়ে প্রার্থনা করছি-
“যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তি রূপেণ সংস্থিতা
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।”
অর্থাৎ যে দেবী শক্তিরূপে সর্বজীবে সংস্থিতা বা বিরাজিতা তাঁকে নমস্কার, নমস্কার, নমস্কার ।

সূত্রঃসনাতন ধর্মতত্ব ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here