চলে গেলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ আজাদ রহমান।

চলে গেলেন সঙ্গীতজ্ঞ আজাদ রহমান

রেডিও মৌ রাজশাহী প্রতিনিধিঃ-

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত সুরকার, সংগীত পরিচালক, ও কণ্ঠশিল্পী আজাদ রহমান আর নেই। গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানী শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্লাহি রাজিউন)। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বরেণ্য এই সুরকারের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তিনি স্ত্রী ও তিন মেয়ে রেখে গেছেন। বরেণ্য এই সুরকারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন। শুক্রবার (১৫ মে) তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সবরকম চেষ্টার পরও শেষে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার এই মৃত্যুতে সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

আজাদ রহমান ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় এক সল্ফ্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম খলিলুর রহমান এবং মায়ের নাম আশরাফা খাতুন। বাবা খলিলুর রহমান ছিলেন একজন উচ্চমানের দক্ষ সংগীতশিল্পী। বাবার কাছেই প্রথম আজাদ রহমান সংগীতে হাতেখড়ি নেন। পরে বর্ধমানের ‘গোপেশ্বর সংগীত সংসদ’-এ দীর্ঘদিন শিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে তিনি যাত্রা, লেটো পালায় গান করতেন। পরবর্তী সময়ে সংগীতের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্থাপিত রবীন্দ্রভারতী কলেজ থেকে খেয়ালে অনার্স সম্পন্ন করেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তিনি লোকগান, কীর্তন, শাস্ত্রীয় ধ্রুপদি, খেয়াল, টপ্পা গান ছাড়াও রবীন্দ্রসংগীত এবং তিন কবি অতুল প্রসাদ, দিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেনের গানের চর্চা চালিয়ে গেছেন। একইসঙ্গে তালিম নেন পিয়ানো বাদনের। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে। ১৯৬৪ সালে তিনি পূর্ববাংলায় চলে আসেন। তারপর থেকে তিনি নিরলসভাবে সংগীত সৃষ্টি করতে থাকেন। দীর্ঘদিন বিভিন্ন সংগীত অনুরাগীর সান্নিধ্যে থেকে আজাদ রহমান শুধু যে একজন খ্যাতিমান গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তা নয়। বরং গান রচনা, সুর সংযোজন, সংগীত পরিচালনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ, শিক্ষকতা সর্বোপরি প্রশাসনিক কর্মদক্ষতা সর্বক্ষেত্রে রয়েছে কাজের ছাপ। এ দেশে খেয়াল সংগীতের অনন্য শিল্পী মর্যাদাও কুড়িয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ সংগীত জীবনে ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘মনেরও রঙে রাঙাব’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’, ‘ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান সৃষ্টি হয়েছে আজাদ রহমানের সুর ও সংগীত পরিচালনায়। ষাটের দশকে তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের শিল্পী হিসেবে সব ধরনের গান পরিবেশন করতেন। বিশেষভাবে উচ্চাঙ্গ সংগীত থাকত তার নিয়মিত সংগীত পরিবেশনায়। পরে ১৯৬৭ সালে সংগীত শিক্ষক, সংগীত পরিচালক ও সংগীত প্রযোজক হিসেবে তিনি রেডিওর চাকরিতে যোগদান করেন। তারপর জাতীয় পারফর্মিং আর্টস একাডেমির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ের পদ অলংকৃত করেন। দ্বিতীয়বার তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০০০ সালে চাকরিজীবন থেকে স্বাভাবিক অবসরে যান।

রেডিও-টেলিভিশন ছাড়াও তার কাজের বড় পরিধি ছিল চলচ্চিত্র। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৭৭ সালে ‘যাদুর বাঁশি’ এবং ১৯৯৩ সালে ‘চাঁদাবাজ’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও ‘চাঁদাবাজ’ ছবির জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় সৃজনশীল কাজের জন্য পেয়েছেন জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭৫), পূর্বাণী চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭৫), চিত্রালী চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭৫), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার (১৯৭৮), দেশ চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭৮), জাতীয় অর্কেস্ট্রা পুরস্কার (১৯৮০), রেডিও স্টাফ আর্টিস্ট পুরস্কার (১৯৮২), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতি পুরস্কার (১৯৯৬), নবাব সলিমুল্লাহ স্মারক সম্মাননাসহ আরও বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *